ভারতকে টপকে যাচ্ছে বাংলাদেশ

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার আগে উন্নয়নশীল দেশ হওয়া শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি সেই গতি হারিয়েছে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের প্রভাবে। অর্থনৈতিক দৈন্যদশায় ভুগতে থাকা পাকিস্তানও ছিটকে গেছে কয়েক বছর আগেই। এ বছর অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ ভারতকেও টপকে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

চলতি অর্থবছরের পাশাপাশি আগামী অর্থবছরও মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকবে বলে জানিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

সংস্থাটি জানিয়েছে, এ বছর দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ২ শতাংশ, ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এপ্রিল-জুনে ভারতের প্রবৃদ্ধির হার গত ছয় বছরে সর্বনিম্নে নেমেছে। দেশটির মানুষের ভোগ্যব্যয় কমেছে, বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনও পড়তির

ধারায়। দেশটির নতুন সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পর এবার ভারতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন হওয়ার সম্ভাবনা কম। পরের বছর ভারতের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ চলতি অর্থবছর ৮ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে পরের বছরও ৮ শতাংশ অর্জন করবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। বাংলাদেশের এই উচ্চ প্রবৃদ্ধির পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি খাতে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি ও কৃষি খাতের সাফল্য। অন্যদিকে এবার পাকিস্তান মোটে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে মনে করছে এডিবি, বিনিয়োগখরা ও বেসামাল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পরের অর্থবছর তা আরও কমে ২ দশমিক ৮ শতাংশে নামবে।

এডিবির হালনাগাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির চালিকাশক্তি এখন ভারত নয়, বাংলাদেশ। ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতি উল্টো দিকে চলছে। ওই সময় থেকে বাংলাদেশ ৭ শতাংশেরও বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনের পর এবার ৮ শতাংশের ঘর স্পর্শ করেছে। অন্যদিকে ২০১৬ থেকেই ভারতের প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি শুরু হয়েছে। ভারতে পণ্যের চাহিদা ও শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ায় এ বছর ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনও কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনীতির চিত্র ভিন্ন। ভারতের প্রবৃদ্ধিতে শিল্প খাতের চেয়ে সেবা খাতের অবদান বেশি, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিতে বড় ভ‚মিকা বিকাশমান শিল্প খাতের। কর্মসংস্থান সৃষ্টির বদলে ভারতের শিল্প খাত এখন কঠিন সময় পার করছে। বছরভিত্তিক বিবেচনায় চতুর্থ প্রান্তিকে ভারতের শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। ভারতের উৎপাদনমুখী খাত দেশটির অর্থনীতিকে আরও হতাশ করে তুলছে। এ খাতে প্রবৃদ্ধি নেমেছে দশমিক ৬ শতাংশে। ভারতের প্রবৃদ্ধিতে বড় ভ‚মিকা রাখা গাড়ি নির্মাণ শিল্পের বিক্রি কমেছে সাড়ে ১০ শতাংশের মতো। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের পর গাড়ি নির্মাণ খাতে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা এখন।

বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলা চলমান চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধের সময়ও ২০১৮ সালের ৬ দশমিক ৭ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ২০১৯ সালে বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ১ শতাংশ। এডিবি বলছে, গত বিশ্বমন্দার সময় থেকে বাংলাদেশ নতুন বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা শুরু করে, সেসব বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের চাহিদা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত, জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বাড়ছে। ব্যবসার খরচ কমানোর চেষ্টার মধ্য দিয়ে সরকার বিনিয়োগ ও রপ্তানিকারকদের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ভারতের রপ্তানি বেড়েছে মোটে ১ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি বছর এপ্রিল-জুনে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি বেড়েছে সাড়ে ৪ শতাংশ ও চীনে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে জার্মানি, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হংকংয়ে ভারতের রপ্তানি অনেক কমেছে।

আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ১ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ার তথ্য তুলে ধরে এডিবি বলেছে, জ¦ালানি, তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল ও নির্মাণসামগ্রীর আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। এর মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের শিল্প খাতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। তবে বেসরকারি বিনিয়োগ কিছুটা ধীরগতির কারণে শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কিছুটা কমেছে। আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের গত বছর দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি এবার প্রথম পাঁচ মাসে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে গেছে।

অর্থনীতির ধীরগতির সময়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ভারতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ৬১ শতাংশ বেড়ে ১৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে এফডিআই আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে আড়াই বিলিয়ন ডলারে।

গত অর্থবছর ডলারের বিপরীতে টাকা মান হারিয়েছে দশমিক ৯ শতাংশ। ওই সময়ে মুদ্রামান স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। অন্যদিকে গত এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ভারতের রুপি দর হারিয়েছে ৩ দশমিক ২ শতাংশ।

আরও পড়ুন